ক্যামেরার পিছনের গল্প/ রহিম ইবনে বাহাজ




এই সুন্দর ভুবনে আমরা সকলেই খুব ছোট্টবেলা থেকেই অনেক স্বপ্নের বীজ বপন করি। আমিও স্বপ্ন দেখতাম। নাটক সিনেমা দেখতে-দেখতে একদিন মিডিয়াতে কাজ করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। অভিনয় করার ইচ্ছে ছিল না
তবে সিদ্ধান্ত নিলাম গল্প লিখে কাহিনীকার হব। লিখেও ফেললাম অনেক গল্প ।ভাগ্য ক্রমে ২০০৪ সালে মাদারগঞ্জে কয়ড়া বাজারে পরিচয় হলো নির্মাতা মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর একান্ত লোক মাসুদ রানার সাথে।আমার আলোচনা শুনে বললেন, আপনার লেখা গুলো আমাকে দিন, বসকে দেখাব। খুবই আনন্দ পেলাম! চারবছর ধরে অপেক্ষার কিছুটা ফল পেলাম। ভাবলাম আরো ভালো লিখতে হবে। মাসুদ ভাইয়ের চাচাত ভাই শাহিন ভাই মিডিয়াতে কাজ করে, সে বলল, আমার সাথে কাজ করুন।অজপাড়া-গাঁয়ে থাকি, ঢাকায় আমার তেমন কেউ ছিল না! তারপরেও ২০০৭ সালে চলে এলাম ঢাকায়। একটি মেসে গাদাগাদি করে সবাই থাকত। রাতেই সমস্ত নিয়ম কানুন বুঝিয়ে দিয়ে গেল।। যেহেতু প্রথম কাজ ভোর ৬ টায় কল, শুটিং ধানমন্ডি একটি দশতলা নতুন ভবনের ছাদের উপর । লাইট ক্যামেরা, ইউনিট আসামাত্রই এক লাইট ম্যান আমাকে বলল, তুমি কি প্রডাকশন বয়? বললাম জি, আমাকে বলল, নিচে যাও লাইট , ক্যামেরা উপরে উঠাতে হবে।ওদের সাথে সরঞ্জাম উঠালাম, পরিচালক আসলেন এম সাখাওয়াত হোসেন। অভিনয় শিল্পী যারা এলেন তাদের মধ্যে যাদের চিনতাম তারা হলেন নায়িকা অহনা ও শামীম জামান। চা-নাস্তা শেষ করে শুটিং শুরু হলো।আমার কাজ দেখে পরিচালক ডেকে বললেন, আজ হতে নিয়মিত কাজ করবে। শুরু হলো আমার পথচলা। সাহস করে বলতে পারলাম না আমিও গল্প লিখি।মাসে ৫/৬ দিন শুটিং হয় বাকি দিন বাসায়। তিন মাস পর ধারাবাহিক নাটকের কাজ। এরপর কাজ করতে করতে কাজের চাপ বাড়তে থাকে!বিভিন্ন পরিচালকের সাথে পরিচয় হয়।এতদিনে মিডিয়াতে আমার নাম ডাক হলো, দায়িত্ব পেলাম ম্যানেজার পোস্টের।আমার কথায় লাইট, ক্যামেরা, লোকেশন বুকিং হয় খাবারের লোককে ফোন দিলেই খাবার পাঠায়। একবার গাজীপুরে হোতাপাড়া শুটিং ছিল তিন দিনের। শুটিং ভালো ভাবেই চলেছিল। যেদিন প্যাকাপ হল পরিচালক বললেন লাইট, ক্যামেরা বিল ঢাকা এসে দেবেন। অফিসে দেখা করতে বলেছিলেন, কিন্তু পরিতাপের বিষয় পরিচালকের ফোন সুইচঅফ! এক মাস পর বললেন, প্রযোজক এখনো টাকা দেয়নি! অথচ সিনিয়র অভিনয়শিল্পীরা শুটিংয়ের আগেই পারিশ্রমিক নিয়ে নেয় বা পরিচালক ভালো হলে কাজের পরেও নেয়। একটি নাটক বা সিনেমার ক্যামেরার পিছনে যাদের এত শ্রম, ঘাম বিশেষ করে প্রডাকশন বয় সে মূল্যয়ন পায় না! রাতে তিনটার সময় পরিচালক চা খাবে, বানিয়ে দাও রাত ১২ টায় শুটিং প্যাকাপ হলে শুটিং হাউজ হতে অভিনয় শিল্পীর নিজস্ব গাড়ি না থাকলে ইউনিটের গাড়ি দিয়ে বাসায় বাসায় পৌঁছে দাও , কারো আবার সি.এনজি ঠিক করে দাও, সবই প্রডাকশনের কাজ তারপরও ন্যায্য শিফটের টাকা পায় না তারা!বাংলাদেশের মিডিয়ার প্রতারণায় কত ছেলে-মেয়ে যে অসহায় তা না দেখলে কেউ জানবে না। কত মজার মজার নাটক দেখে সবাই, কত সুন্দর অভিনয় কিন্তু নাম আর দাম শুধু অভিনয় শিল্পীদের। তবে ছোট পর্দার সব পরিচালক প্রতারক নয়। আমি ছবিয়াল পরিবারে কাজ করেছি, টাকা সাথে সাথে পেয়েছি। চোরাবালি ছবির পরিচালকের রেদেওয়ান রনি ভাইয়ের সাথে ইফতেখার আহমেদ ফাহমির হাউজ ফুল নাটকের কাজ করার সময় পরিচয়।আশফাক নিপুনও একদিন ডেকেছিলেন পরিচালক আলিফিতা একরাম তজো ভাইয়ের বাসায়। চ্যানেল আই এর জন্য ধারাবাহিক নাটকের কাজ করা লাগবে। শুনে আমি রাজি হলাম। নাটকের নাম মুকিম ব্রাদাস মিরপুর ১২ নাম্বার। সপ্তাহে তিনদিন শুটিং হতো। যত দূর মনে পড়ে ঈদের আগে নুশরাত ইমরোজ তিশা আপার মা, আমাকে ৫০০০ টাকা দিয়ে বললেন, ভালো ভাবে ঈদ করো। আমাকে খুব স্নেহ করতেন তিনি। ক্যামেরার পিছনের গল্প দর্শক কত টুকু জানে! যদি জানত আফসোস করত! মার, গালি, লাথি এছাড়া খাবার খারাপ হলে বিল হবে না, পরে দিচ্ছি, কত কী!এসবের সব দায় প্রডাকশন ম্যানেজারের । পরবর্তিতে শুটিংহাউজ খাবার অর্ডার করলে খাবার দেয় না! পরিচালক টাকা না দিলে ম্যানেজার কোথা থেকে টাকা দেবে! খাবার এর লোক ভাবে ম্যানেজার টাকা নিয়ে খেয়েছে!এখানে কেউ কাউকে সহ্য করে না! ঢাকার বাহিরে মানে আউটডোরে নতুন জায়গায় শুটিং হলে কারো বাড়িতে থেকে শুটিং করতে হয় অনেক সময়। ক্যামেরার পিছনের লোকজন আগের রাতে যেতে হয় সেখানে কিন্তু থাকার জায়গা পর্যাপ্ত হয় না!অথচ এ বিষয়গুলো পরিচালক জানে কিন্তু, সব কিছু সহ্য করে নিয়ে কাজ করতে হয়।একবার, ভবানীপুর এক হিন্দু লোকের বাড়ীতে শুটিং। রাত দু’টোয় নায়ক নিরব ভাই গেলেন সেখানে।। কনকনে শীত! কোথায় থাকবেন তিনি!সবাই ঘুমিয়েছে। আগেই জানতো আমি আছি সেখানে। আমার নাম ধরে ডাকলে আমি উঠলাম এবং আমি ঢাকা থেকে যেএকটি কম্বল নিয়ে গিয়েছিলাম, দিয়ে বললাম, নেন শুয়ে পড়ুন। আমি বাকি রাতটুকু বসে-বসে কাটিয়ে দিলাম। কত ধরনের যে যন্ত্রণা বলে শেষ করা যাবে না!অনেক আর্টিস্ট আছেন বলেন রং চা দাও তারপর আবার হয়ত বলবে না না আমি তো রং চা চাইনি! কথার উত্তর দিলে পরিচালক কে বলবে, আমি কাল হতে কাজ করব না যদি এই ছেলে এখানে কাজ করে! আমি উপলব্ধি করেছি ছোট পর্দার মানুষগুলো কেনো এমন হয়! একটি শুটিং ইউনিটের প্রায় ২০/৩০জন লোক থাকে, সব কিছুর দায় দায়িত্ব, ব্যবস্থাপকের এর বহন করা লাগে, ভোর ছয়টায় কল থাকে শুটিংস্পটে সবার আগে এসে সব প্রস্তুতি শেষ করা লাগে।ক্যামেরার পিছনের গল্প আমার বানানো কোন গল্প নয় একদম আমার জীবন থেকে নেয়া। শুধু মাত্র কিছু ভন্ড, নষ্ট, প্রতারকদের জন্য খুব কষ্ট হয়, ভাবতে বিস্ময় লাগে!আজ একটি ঘটনা উল্লেখ করছি, ঘটনাটা এত বছর পর লেখছি হয়ত সৃষ্টিকর্তার দয়ায় এখনো বেঁচে আছি বলে। ২০০৯ সালে রাতে ফোন আসে একটি সিনেমার কাজ আছে। পাবনা ইশ্বরদী শুটিং।প্রথম লটের কাজ, শুটিং ইউনিটের সাথে গেলাম।ছবির পরিচালক আশরাফ শিশির বললেন, “আমরা একটা সিনেমা বানাব”। পরিচালকের নিজের গ্রাম যতটুকু জেনেছি পাকশী। কাগজের মিলের পুরাতন একটি ঘরে পুরো ইউনিটের লোক জন থাকার জায়গা!সবকিছু ঠিক ভাবে চলছিল, সাত দিন পর আমরা প্রায় তিন মাইল দূরে কাজ করছি বিকাল বেলা, সহকারী পরিচালক আমাকে আর মেকাপ ম্যান এর সহকারীকে ডেকে বললেন গাড়িতে উঠো,উঠলাম। সোজা চলে গেলাম আমাদের ক্যাম্পে, আমাদের দুজনকে বললেন তোরা মোবাইল চুরি করেছিস, বের কর। ইচ্ছে মতো আঘাত করলেন! চোখ দু’টো বেঁধে অমানষিক নির্যাতন চালিয়ে ছিল আমার উপর! অনেক পানি পিপাসা পেয়েছিল, মুখে থুতু দিয়েছে! সিগারেটের আগুন জ্বালিয়ে শরীরে ক্ষত করেছিল! চিৎকার করতে পারিনি মুখ ও হাত বাঁধা ছিল! একটু পর কানে ভেসে আসল মাগরিবের আযানের ধ্বনি। একটি গাড়িতে উঠাল টের পেলাম , চোখের বাঁধন খুলে দিলো এবং মুখের টাও। দেখি একটি কলার বাগানে। বললাম, ভাই একটি মোবাইলের জন্য জীবন দিতে হবে? কত লক্ষ টাকা দাম?ঢাকা গিয়ে কিনে দেবো তবু আমার জীবন ভিক্ষা দেন!অপর প্রান্ত হতে ওদের ফোন করে পরিচালক আশরাফ শিশির বললেন, ওরা স্বীকার করেনি এখনো? ওদের মেরে পদ্মানদীতে ভাসিয়ে দে! আফসোস যে পরিচালক আশরাফ শিশিরের সিনেমাতে একটি পিঁপড়া হত্যা হয়নি এতটা সাবধানে কাজ করতে হয়েছে।কিছু ক্ষণ পর আবার ফোন, বলল ওদের ছেড়ে দে।আমাদেরকে ক্যাম্পে নিয়ে আসলো। সবাই অবাক হয়ে জানতে চাইলো কি হয়েছে কি ঘটনা? আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলো।রাতে ঢাকা আসলাম, শাহিন ভাই কে ফোনে বললাম বাসায় আসেন। আমার অবস্থা দেখে কেঁদে ফেললেন তিনি।আমরা পরিচালক আশরাফ শিশির এর সাথে যোগাযোগ করলাম, উনি বললেন, একটি র্দূঘটনা, মামলা করতে চেয়ে ছিলাম, কিন্তু, করিনি মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে বিচার দিয়েছি। ২০১৩ সাল হতে আমি মিডিয়া হতে অনেকটা দূরে, আর সাধ নেই মিডিয়ায় কাজ করার।সহকর্মীরা মাঝে মধ্যে ফোন করে, খোঁজ নেয়, ক্যামেরার পিছনের মানুষগুলো, ভালো থাকুক, পরিচালক, প্রযোজক, সঠিক ও সময় বকেয়া পরিশোধ করুক।আমার অবিরাম ভালোবাসা সবার প্রতি।

কবি আঞ্জুমান আরা খান

সকল পোস্ট : আঞ্জুমান আরা খান