আহারে জীবন / রানা ইবনে আজাদ

পর্ব২

নওগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেনীতে ভর্তি হলাম। বিশাল এক স্কুল ক্লাস ভর্তি স্টুডেন্ট। ময়মনসিংহের খুপরি মতো স্কুল থেকে এসে বিশাল সমুদ্রের মতো এক স্কুলে ভর্তি হয়ে পাংগাশ মাছের মতো খাবি খেতে লাগলাম। সারাক্ষণ চিল্লাচিল্লি লেগেই আছে কখনো শিক্ষক চিল্লান কখনো ছাত্রছাত্রী চিল্লায়। প্রথম যেদিন স্কুলে গেলাম ভেবেছিলাম প্রথম বেঞ্চে বসব কিন্তু প্রথম বেঞ্চ আগেই দখল হয়ে আছে। গুনে গুনে পঁচিশটা বেঞ্চ পার হয়ে এক কোনায় বসার সুযোগ পেলাম। সহপাঠীদের আমার একদম পছন্দ না! আমি নিশ্চিত সবগুলো আমার থেকে বড়। আমার পাশের জন তার ভাঙা দাঁত দেখিয়ে বলল আমার সাথে লাগতে আসিস না! দাঁত ভেঙে দেবো। আমি নিজেকে যতটা পারি ছোটো করে ফেললাম। স্কুল ছুটির ঘন্টা পড়তেই যেন পায়ে পাখনা গজালো। উড়ে বাড়ি চলে গেলাম এবং ঠিক করলাম আমি আর পড়াশোনা করব না।

বড়দা হাই স্কুলে ভর্তি হলো। তার মন একদম ভালো না। শিউলি আপার জন্য খালি কেমন কেমন করে।চিঠির পর চিঠি লিখে যাচ্ছে কোন জবাব পাচ্ছে না। আমাকে বললো সে নাকি একাই ময়মনসিংহ যাবে। আমি ভয়ে চোখ বড় করে বললাম, দাদা এই ভুল করিস না। বাবা পিঠের ছাল তুলে নেবে। ছোহ আমি কি তোর বাপরে ডরাই নাকি, মাথায় একটা রুমালের মতো কী একটা বেঁধে রাখে সারাক্ষণ।ওটা নাকি শিউলি আপা দিয়েছে। আমার খুব পছন্দ হয়েছে ভাবছি রাতে বড়দা ঘুমালে চুপিচুপি গিয়ে ওটা চুরি করতে হবে। দুই তিন বার একশানে নেমেও সুবিধা করতে পারি নাই। বড়দা যে ওটা কোথায় লুকিয়ে রাখে কে জানে।

বাবা নওগাঁ এসে বিশাল একটা কাজ করে ফেলেছে। তিনি দুইতলা একটা মাটির বাড়ি ভাড়া করে ফেলেছে। বাড়িটা শহর থেকে বেশ দূরে। হাঁটা পথে মাইল দুই হবে। প্রতদিন আমাদের দুই মাইল হেঁটে স্কুলে যেতে হবে ভেবে এখনি আমার পা ব্যাথা করছে । বড়দা আফসোস করতে লাগল। ময়মনসিংহ থেকে হেড লাইটের বাকি পার্টগুলো আনতে পারলে একটা মটর সাইকেল বানিয়ে ফেলতে পারতো তাহলে দুই ভাই মিলে মটর সাইকেলে স্কুলে যেতে পারতাম। আম্মা খুব খুশি। তিনি উঠে পড়ে লেগেছেন বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে। বড়দার মুখ দেখে বুঝতে পারছি তার বাড়ি পছন্দ হয় নাই। আমার অবশ্য এমন কিছুই মনে হয় নাই। তবে অঞ্জু খুব খুশি সে মোটামুটি পুরো বাড়ি জুড়ে চার হাত পায়ে গড়িয়ে বেড়াচ্ছে আর যা পাচ্ছে তাই মুখে দিয়ে জিভ আর ঠোঁট দিয়ে ফুরুত ফুরুত করে অদ্ভুত শব্দ করছে। এটাই মনে হয় ওর আনন্দ প্রকাশের ভঙ্গি। বাবা খুব গাম্ভীর্যের সাথে আমাকে আর বড়দাকে বুঝালেন মাটির বাড়িতে থাকার নানান বৈজ্ঞানিক উপকারিতা। মন আর দেহ শান্ত থাকে। আয়ু বাড়ে ইত্যাদি। বড়দা ফিসফিস করে বলল অন্যকারো আয়ু বাড়ুক আর না বাড়ুক অঞ্জুর বাড়বে ও যেভাবে পোকামাকড় খাচ্ছে কয়দিন পরে ও চীনে চলে যাবে। আর চীন দেশের সবার আয়ু ১০০ বছর। আমি অবশ্য বড়দার কথা বিশ্বাস করি নাই। সবকিছুতে বাড়িয়ে বলা ওর স্বভাব।

দুইবেলা করে আম্মা মাটির বাড়ির উঠান ঝাড়পোচ করতে লাগলেন। উপর নিচ মিলিয়ে মোট ছয়টা রুম বাড়িটার। বড়দা গম্ভির ভাবে বলল সে উপর তলায় থাকবে। আমারো ইচ্ছা হচ্ছিল কিন্তু বাবার কড়া আদেশ নিচে একজন থাকা চাই। অগ্যতা আমার আর কী করা। বাড়ির চারিদিকে বড় বাগান। বাগান আমার একদম পছন্দ না, সারাক্ষণ কেমন নিরব নিরব একটা ভাব আর ঝিঁঝি পোকার ডাকাডাকি। এলাকার অনেকেই বলে আমাদের বাড়িটা নাকি ভূতের বাড়ি এই জন্যই সস্তায় আমরা বাড়ি ভাড়া পেয়ে গেছি। আম্মা শুনে একটু গাইগুই করেছিলেন বাবার ধমকে আম্মা একদম চুপ। আমার ভূতে ভীষণ ভয়। রাতে ঘুমানোর আগে দুনিয়ার সব জানা না জানা সুরা দোয়া পড়ে ঘুমাতে যেতাম।

মাটির বাড়িতে থাকলে আয়ু বাড়ে কিন্তু বাবার আয়ু কয়দিন পরে একদম থেমে গেল। হঠাৎ করে বাবা কাউকে কিছু না বলে মারা গেলেন।বাড়ির পেছনে লতা পাতা সাফ করে ওখানেই আব্বাকে কবর দেয়া হলো। সবাই বলাবলি করছে আমরা এতিম হয়ে গেছি। আমি বড়দাকে জিজ্ঞাসা করলাম দাদা আমরা কি এতিম খানায় থাকব এখন থেকে। বড়দা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, না আমরা একসাথে এই বাড়িতে থাকব। আম্মা একদম চুপ হয়ে গেল অঞ্জু সারাদিন কান্নাকাটি করলেও ফিরে তাকায় না। আমি অঞ্জুকে নিয়ে বনে বাদারে ঘুড়ে বেড়াই। অঞ্জু এখন কথা বলতে পারে। আমাকে ভাভা ডাকে আর বড়দাকে খালি দা ডাকে। তিনদিন ধরে আমাদের বাসায় কোন রান্না নাই। ক্ষুধায় পেট কেমন জানি করে। চোখ বন্ধ করলেই ভাতের থালার ছবি দেখি। পানি খেয়ে খেয়ে দিন পার করছি। আম্মা বিছানা নিলেন। বড়দা কিছু একটা করার চেষ্টা করছে, প্রতিদিন বলে যাচ্ছে আজ দেখবি বিল্টু দানে দানে ছক্কা মেরে আসব কিন্তু প্রতি সন্ধ্যায় ক্লান্ত দাদা ফিরে আসে। আমি জানি দাদা কিছুই করতে পারবে না তারপরও আমি অপেক্ষায় থাকি দাদার।

আম্মা মনে হয় মরে যাচ্ছে। ঘর থেকে একদম বেরুচ্ছে না। না খেয়ে থাকতে থাকতে শুকিয়ে গেছে। একবার দরজার কাছে গিয়ে উঁকি মেরে দেখেছিলাম সাদা একটা কিছু বিছানায় পড়ে আছে মনে হলো। আজকাল অঞ্জু আমার পেছন পেছন ঘুরে বেড়ায়। আম্মার কোলে যেতে চায় না। আমি বনের ভেতর কিছু ফল খুঁজে পেয়েছি খুব ক্ষুধা পেলে লুকিয়ে গিয়ে খাই। অঞ্জু আমার পেছন পেছন যায়। ওর ক্ষুধা পেলে মুখের ভেতর আঙুল দিয়ে চুষতে থাকে। আম্মা যে ঘরে থাকে তার দরজার কছে আমি বসে অঞ্জুর সাথে খেলছিলাম। হঠাৎ আম্মার গলা শুনতে পেলাম আম্মা ফিসফিস করে আমাকে ডাকছে। আমি ভাবলাম আম্মা মারা যাচ্ছে। আম্মা আমাকে একটা কাগজ দিয়ে বললেন এখানে নানার ঠিকানা আছে সেই ঠিকানায় একটা চিঠি লিখতে। আমি কখনো চিঠি লিখি নাই। কি করে লিখে জানি না। তারপরেও লিখলাম প্রিয় নানাজান, উনি আমার প্রিয় কি না জানি না। খালি নানাজান লিখলেও হতো অথবা খালি নানা। আব্বার মৃত্যুর সংবাদ আর আমরা না খেয়ে আছি জানিয়ে চিঠি লেখা হলো। কিন্তু পোস্ট করব কোথায় জানা নাই। আম্মা বড়দার কথা বললেন সামসু এসে পোস্ট করে দেবে। শীর্ণ কাঁপা পায়ে আম্মা উঠে দাঁড়ালো। আঞ্জুকে কোলে নিয়ে ঘরের এক কোনা থেকে চাল এনে চুলায় বসিয়ে দিলেন। গরম ভাতের গন্ধে মন ভরে গেছে। আজ অনেক দিন পরে ভাত খাবো। বড়দা সন্ধ্যায় হাতে করে একটা বড় রাজহাঁস নিয়ে এলো। বলল এটা আজ জবাই করে ভুনা করা হবে। রাতে পুলিশ এসে বড়দা কে ধরে নিয়ে গেল। বড়দা নাকি কোন বাড়িতে চুরি করে হাঁস ধরে বাজারে বেচে দিয়েছে।

দুই বছর তিন মাস পর নানা এলো। ততদিনে আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। বড়দা পার্মানেন্ট ভাবে চোরের দলে নাম লিখিয়ে ফেলেছে। বছরের দুই তিনবার জেলে যাচ্ছে আবার হাসিমুখে বেরও হচ্ছে। আমাকে প্রায় বলে কি করলি রে বিল্টু আমাদের দলে নাম লেখা একটা অপারেশন করে আসি চল। আমি হাসি দিয়ে এড়িয়ে যেতাম। নানা বাড়ির উঠানে পা দিয়ে কেঁদে দিলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ খুব কাঁদলেন। কিন্তু আমি অনেক খুশি আমাদের অভাবের সময় শেষ তাই। নানা হাত ভর্তি করে বাজার করলেন, চাল ডাল সব কিনলেন। বড়দা সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে নানাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলো ওই ওল্ডফেলো কখন আসলো। বড়দা আজকাল কথায় কথায় ইংরেজি বলে। আমাকে সেদিন ইয়াং ম্যান বলল। আম্মা বড়দার কোন কিছুই ছুঁয়ে দেখে না। বড়দা কিছু আনলে খান না। বড়দা হাসি দিয়ে বলে ওল্ড উইম্যান গুড ফর নাথিং কি এখনো এ্যাংরী। আমি আর অঞ্জু বড়দার আনা সব খাবার খাই। অঞ্জু আজকাল খুব চকলেট খেতে চায় , বড়দা পকেট ভর্তি করে চকলেট আনে কেবল যে কয়দিন জেলে থাকে তখন অঞ্জু আমার সাথে ঘ্যানর ঘ্যানর করে। অঞ্জু আজকাল কটকট করে কথা বলে। আম্মার কাছে তেমন একটা যায় না ।

নানা আবার আসবেন বলে চলে গেল।সাথে করে আমাকে নিতে চাইলো কিন্তু আম্মা রাজি হলো না আমি কিন্তু রাজি ছিলাম আমার ক্ষুধা একদম সহ্য হয় না! আম্মা আমার হাত শক্ত করে ধরে বসে রইল। আম্মা জানালার পাশে বসে থাকে নানার অপেক্ষায়। আমার কেন জানি মনে হলো নানা আর আসবে না।

কবি আঞ্জুমান আরা খান

সকল পোস্ট : আঞ্জুমান আরা খান