এমপিও শিক্ষকরা পেয়ে যাক এমপিও// গোলাম মোর্তুজা


কামারের কাজ কি কুমোর দিয়ে চলে। একজন কামারকে লোহা দিয়ে যা তৈরি করতে বলবেন তা-ই বানাতে পারবে। মাটির তৈরি যা আপনার প্রয়োজন তা কি বানিয়ে দিতে পারবে। না, তা তো সম্ভব নয়। দুজনেই সৃষ্টি করে। কিন্তু দুজনের সৃষ্টিশীলতা দু’রকম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব পরিবর্তন হয় তবে কী কামাররা কুমোরের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। না, এটা ভাবা বোকামি। তেমনি যারা শিক্ষক হওয়ার মানসে মহান পেশায় ঢুকে বছরের পর বছর বেতন না পায় তবে কি শিক্ষকতা পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় দ্বারস্থ হবেন? পেশা পরিবর্তন করা নিজের সঙ্গে নিজের প্রতারণা করা একই কথা। তাছাড়া একজন শিক্ষক যে কিনা অন্যান্য পেশার হাতছানিতে সাড়া না দিয়ে মহান সম্মানীয় পেশাকে বেছে নিয়েছেন। শিক্ষিত, দেশপ্রেমিক সুনাগরিক তৈরিতে অবদান রাখার জন্য শিক্ষকতা একটি মোক্ষম পেশা- বড়দের কাছে থেকে এরকম কথা শুনে, তিনি শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় থেকে শিক্ষক হওয়ার বাসনাকে লালিত করে অবশেষে শিক্ষক। অথচ শিক্ষকদের নিয়ে নানান এক্সপেরিমেন্ট। এটা যেকোনো কল্যাণ দেশের জন্য কাম্য হতে পারে না।

একটি প্রতিষ্ঠান একদিনে বা রাতারাতি গড়ে ওঠে না। প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেই কোনো রূপকথারও গল্প। একটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদন পেতে শর্ত পূরণ করতে হয় কমপক্ষে ১৪টি। প্রয়োজনীয় জমি, ক্লাসরুম, পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার, শিক্ষক কর্মচারী থাকতে হয়। এ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখলেই কেবল নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি পাওয়া যায়। প্রথম তিন বছর পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী, পাসের হার, স্থায়ী অবকাঠামো চূড়ান্ত হলে একাডেমিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। স্বীকৃতির তিন বছর পর আবার নবায়ন করতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে যত প্রক্রিয়া মেনে চলা হয় তাতে তো নন-এমপিও শব্দটি শিক্ষা অভিধানে থাকাই উচিত না। একথা কাকে বলব। সবাই আশ্বাস দেয়, তবে বিশ্বাস খুঁজে পাওয়া যায় না। একটি প্রতিষ্ঠান খোলার প্রাক্কালে আরও সচেতন হয়ে সমস্ত যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিষ্ঠানকে পাঠদানের অনুমতি দিলে কী প্রতিষ্ঠান অটোভাবে এমপিও হতো। না, সেটাও বোধকরি সম্ভব হতো না। শিক্ষা খাতটাই কেমন জানি অগোছাল, খাপছাড়াভাবে চলে। শিক্ষকদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য কই দৃশ্যমান কাউকে কথাও বলতে শুনি না। বাংলাদেশে কর্তা-ব্যক্তিরা অনেক সময় কথার কথা বলেন। সে কথাতে ভাব থাকে কিন্তু তা পালনের কোনো রেশ থাকে না।
শিক্ষা খাতে মন্দাভাব কোনোদিনই কাটেনি। কাটছে না। কাটানো যাচ্ছে না। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও শিক্ষার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ খাতকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী কল্যাণবান্ধব করা গেল না।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নানা রকম গরমিলের ব্যাপার আছে। আপাতত সে বিষয়ে আক্ষেপ না করে নন-এমপিও নিয়ে বলা যাক।

এমপিও নামক স্বপ্নের জাদুটা ধরা দিল না। আহ! নন-এমপিওদের কষ্ট দেখলে মন ভেঙে যায়। বুকের ভিতর জ্বালা ধরে। যারা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক পৃথিবী স্বপ্ন নিয়ে ঢুকলেন। সে স্বপ্নগুলোকে চোখের সামনে হত্যা হতে দেখে অবাক হই। আফসোস! নন-এমপিও হয়ে অনেকের জীবন অসহ্য হয়ে যাচ্ছে। অভাব নামের দানবটা নন-এমপিওদের জীবনটাকে তিলে তিলে শেষ করার উপক্রম করছে।

সর্বশেষ ২০১০ সালে এক হাজার ৬২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল। সে সময়ে সব সংসদ সদস্যের পছন্দ অনুযায়ী এমপিওভুক্তি করা যায়নি বলেই সে সময়ের শিক্ষামন্ত্রী সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে পড়েছিলেন। বড়ই দুর্ভাগা দেশ! এমপিও হতে হলে সংসদ সদস্যদের পছন্দক্রম লাগে। শিক্ষার এহেন নাজুক অবস্থা দেশের জন্য সুখকর হতে পারে না।

এরপর প্রায় দশ বছর পার হলো। এর মধ্যে এমপিওভুক্তির দাবিতে নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা বহুবার আন্দোলনে নামেন। রাস্তায় নেমে আসা অনেক শিক্ষক ও কর্মচারী আজ নেই। জীবনের যোগফলে শূন্য আর শিক্ষক পেশা গ্রহণের বঞ্চনায় শেষ হয়ে পরপারে চলে গেছেন। এটা কোনো কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের কাম্য হতে পারে না। কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে, দেশের মানুষের পাশে ছায়ার মতো দাঁড়ানো। যে রাষ্ট্র বা দেশ এই কাজটি যত সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারে, সেই রাষ্ট্র বা দেশ হবে তত কল্যাণমুখী।

এলো ২০১৮ সাল। ভাবা হলো সকল স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বুঝি এমপিও হবে। এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন চাওয়া হলো। নন-এমপিওদের চোখে আগামীর স্বপ্ন, মুখে আরও ক’টা দিন বাঁচার প্রেরণার কথায় চারদিক সরগরম হলো এই ভেবে, সূর্যোদয়ের আলো ঝিলমিল সকাল আসল হয়তো। অনলাইনে আবেদন হলো। এমপিওভুক্তির জন্য ৯ হাজার ৪৯৫টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করল। অনেকেরই ধারণা ছিল এতদিন পর এমপিও মশাল প্রজ্জ্বলিত হচ্ছে অতএব আবেদনকৃত সব প্রতিষ্ঠান হয়তো এমপিও পাবে। না, তা হলো না। স্বপ্ন, স্বপ্নই থাকল। ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর ২৭৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ছাড়পত্র পেল। না, এটাও সঠিক হলো না। পরে প্রতিষ্ঠানের সকল দলিল-দস্তাবেজ যাচাই-বাছাই অন্তে সিদ্ধান্ত হলো এমপিওভুক্তি পাওয়ার মতো যোগ্যতা আছে মাত্র দুই হাজার ৬১৫টি প্রতিষ্ঠানের। এমপিও নীতিমালা পূরণ না করাই এবং যুদ্ধাপরাধী ও দাগী আসামির নামে প্রতিষ্ঠিত বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানও এই এমপিওভুক্তি থেকে বাদ পড়েছে। বলা যায়, ভালোই হলো এমপিওভুক্তি যজ্ঞ।

২০১৯ সালের শেষের দিকে বিশেষ ক্ষমতা বলে সরকার আরও ৭টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেছিলেন। এটাও বেশ ভালো খবর। যোগ্য অথচ বাদ পড়েছিল বলেই হয়তো এমন তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। নীতিমালার কঠোর শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে যায়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এমপিও খাতে বরাদ্দ ৪০০ কোটি টাকার বেশি ফেরত যায় রাষ্ট্রের কাছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন সেই টাকার সদ্ব্যবহার করতে পারল না? নীতিমালা শিথিল করে আরও কিছু প্রতিষ্ঠানকে এমপিও দিলে কি ভালো হতো না? নীতিমালা তো মানুষই তৈরি করে মানুষের প্রয়োজনে, নন-এমপিওদের সুবিধার জন্য একটু সহনীয় করলে রাষ্ট্রের তেমন ক্ষতি হতো বলে মনে হয় না। দীর্ঘদিন থেকে খাবি খাওয়া প্রতিষ্ঠান, শুধু কি প্রতিষ্ঠান? না, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাজার হাজার পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়েও কাজটি করা যেত বলে বিশ্বাস করি। নীতিমালায় শহর ও গ্রামের মাঝে বৈষম্য থাকায় শুরু হয় আন্দোলন। এমপিও নীতিমালায় এই সামান্য কাজে সময় লেগে যায় দু’বছর। হায়! এমপিও নীতিমালা সংশোধন বুঝিবা ভীষণ জটিল কাজ। আসলেই কাউকে কিছু দিলে এত বিধিবিধানের তোয়াক্কা করলে চলে না। নীতিমালা সংশোধনেই যদি এতটা সময় লেগে যায়, তবে কী আর আশার বীজ উপ্ত হয়! তবুও মানুষ আশার তরেই বেঁচে থাকে। অনেক এমপিওপ্রত্যাশী শিক্ষকও নীতিমালা জটিলতার সময়ে হাহাকারের সঙ্গে আর না পেরে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। সংশোধিত নীতিমালা এ বছরের মার্চে জারি করা হয়। এটা মন্দের ভালো খবর। নীতিমালা জারির কতদিন পর সংশ্লিষ্ট কাজ শুরু হবে বা হয় তারও কি কোনো আবার নিয়ম-টিয়ম আছে নাকি বলা মুশকিল। এই নিবন্ধ লেখাকালে (আগস্ট) পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান কাজের ফিরিস্তি চোখে পড়ল না। মার্চ থেকে আগস্ট ছয় মাস পরও কাজ শুরু হচ্ছে না। তবে শোনা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বরে এমপিও আবেদন চাওয়া হবে। আবেদন চাইতেই নীতিমালা হওয়ার পরও ছয় মাস লেগে যায় তাহলে এমপিও আবেদন হওয়ার পর পুঙ্খানুপুঙ্খ অবলোকন করে ফলাফল দিতে কতদিন লাগবে দেখার বিষয়।

এমপিও নীতিমালা কেন?

একটি প্রতিষ্ঠান চালুর আগেই সব দেখে নিয়ে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার একটা নির্দিষ্ট সময়ে এমপিও হলে- এই নীতিমালা সংক্রান্ত যত সময়, শ্রম, অর্থ ব্যয়িত হয়েছে তা রক্ষা করা যেত। না, তা হলো না, হচ্ছে না। অনেকেই বলতে পারেন, অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে তো যাচাই-বাছাই করার জন্য একটি নীতিমালা থাকা জরুরি। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। তো একটি কথা বলি, প্রতিষ্ঠান গড়তে যে বা যারা অনুমতি দেন তারা প্রথমেই প্রতিষ্ঠান তৈরির শর্তগুলো কঠোর হস্তে যাচাই করে নিলে কী হয়। এই কাজ প্রথমেই করলে অনেক ঝুঁকি ও ঝামেলা এড়ানো যায়। আচ্ছা না হয় বুঝলাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রারম্ভে প্রতিষ্ঠান খোলার নীতিমালা বাছাই করা গেল না। তো পরবর্তীকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যখন একাডেমিক স্বীকৃতির জন্য বোর্ডের পরিদর্শকদের পরিদর্শনে পাঠান সেসময়ে সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে সঠিক ও বৈধ পন্থায় রিপোর্ট পেশ করলে যা হওয়ার তাই হোক। তখন কোনো প্রতিষ্ঠান বাদ পড়লে ততটা দুঃখ থাকে না। কিংবা সেসময়ে সম্মানীয় পরিদর্শকবৃন্দ প্রতিষ্ঠানে যে যে শর্ত পূরণ হয়নি তা পূরণ করতে বললে বেশ ভালো হবে। তখন প্রতিষ্ঠান প্রধানরা অপূরণীয় শর্তগুলো পূরণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগে থাকবে। এতে কী হবে একসময় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হবে। প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হবে। কিন্তু যখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক একাডেমিক স্বীকৃতি পাওয়ার পরও একটি প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর বিনা বেতনে কাজ করে যায়। আর যখন এমপিও দেওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ আসে তখন নীতিমালার জালে আটকে পড়ে। নন-এমপিও শিক্ষক, কর্মচারীরা নাজেহাল হয়ে যায়। একদিকে অনেক টাকাকড়ি দিয়ে প্রতিষ্ঠানে ঢোকা আর অন্যদিকে নন-এমপিও হয়ে কালাতিপাত করা যেন অভিশাপ হয়ে ধরা দেয়। বেঁচে থাকা আর পরিবার চালানোর বাসনা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। নন-এমপিওদের এ দুঃখ কারে বলা যায়! বছরের পর বছর অর্থহীন, সমাজে অস্তিত্বহীন হয়ে বাঁচা কী যে দুর্বিষহ তা নন-এমপিও মাত্রই বোঝেন। অনেক সময় নীতির প্রশ্নে আপসহীন হলে চলে না, সেক্ষেত্রে মানবিক হওয়া চাই। নইলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল্যমান কমে যায়। এখন পর্যন্ত যত নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান আছে সব একসঙ্গে এমপিও করা উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সময়েই প্রতিষ্ঠান খোলার জন্য যত নিয়ম আছে সব যাচাই-বাছাই করেই দেওয়া কর্তব্য বলে মনে করি। এমপিও করার জন্য তাহলে নতুন করে নিয়ম করার প্রয়োজনও পড়বে না। একটু সচেতন হয়ে কাজটি করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাই।

নন-এমপিও শব্দটির চিরতরে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়। সত্যি কথা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি রাখার প্রয়োজন পড়ে না। শিক্ষার মান ও ধরন ঠিক রেখে শক্ত হাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার যাবতীয় প্রক্রিয়া দেখাশোনার জন্য একটি বিশেষ শিক্ষা কমিটির বড় প্রয়োজন। সে কমিটি সারা বছর শুধু একই কাজ করে যাবেন। ‘নীতি মানলে প্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি মিলবে, নইলে নয়’ এই নীতির উপরই অটল ও অবিচল থাকতে হবে। শিক্ষা কমিশনটিকে দুর্নীতিমুক্ত থেকে ভয়কে জয় করে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করতে হবে। বলতে হয়, প্রথমে অনেক সমস্যা এসে ভিড় করবে কিন্তু কিছুদিন পর সব কেমন সহজ হয়ে যাবে। একটি ট্রেনকে পোক্ত চালক দিয়ে রেলে ছেড়ে দিলেই চলবে। তারপরও ট্রেনটি দেখভাল করার জন্য কিছু লোক নিয়োগ যেমন দিতে হয়, ঠিক তেমনি শিক্ষা কমিশন গঠন করে ছেড়ে দিলেই হলো না, সে কমিশনকে অবজার্ভ করার জন্য আবার কিছু সংখ্যক শিক্ষিত দেশপ্রেমিক নিয়োগ দেওয়ারও প্রয়োজন আছে। এ ব্যাপারে আমাদের জনদরদি সরকারই যথেষ্ট। সর্ষের ভিতরেই যে ভূত লুকিয়ে থাকে। এই ভূত দূর করার জন্য শিক্ষিত দেশপ্রেমিক নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা।

১৫ জানুয়ারি ২০২০-এ প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকের তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে শর্ত ভঙ্গ করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ওসব প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকাংশরই নিজস্ব জমি নেই, ভাড়া বাড়িতে থেকে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ওসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বছরজুড়ে শিক্ষার্থী দেখা যায় না। শুধুমাত্র পরীক্ষার সময় কিছু শিক্ষার্থীর নাম দেখা যায়। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেখান থেকে পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। তখন তারা ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে ওইসব অখ্যাত প্রতিষ্ঠানে এসে পরীক্ষা দেয়। নিজস্ব স্থান বা কাম্য স্টুডেন্ট না থাকাই কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বীকৃতি পায় তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি চক্রই এ ধরনের কাজ করে। তাদের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? সময় আসে, সময় যায় শিক্ষার সঙ্গে যারা জালিয়াতি করল তাদের তো বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে দেখি না। শিক্ষার হালচালে কোনো পরিবর্তন হয় না। এমপিও হওয়ার কালে আজকের জনপ্রিয় সরকার ঘোষণা দিয়েছিলেন, এমপিওভুক্তি একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিবছরই যোগ্য প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করা হবে। না, প্রতিবছর হলো না। বছর বছর নানান অজুহাতে হয়নি এমপিও। চলমান প্রক্রিয়া-বলতে যেকোনো ব্যক্তিমাত্রই বোঝেন। কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে চলতে দেখি না। চলমান প্রক্রিয়া কেনইবা স্থির আবার কখনো-সখনো থেমেই থাকে। চলমানের অর্থটাই আমাদের কাছে নিশ্চল হয়ে গেছে। বরং গত তিন বছরে শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একাডেমিক স্বীকৃতি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এমনিতেই একাডেমিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিও পায়নি তার উপরে আবার একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান করার বিষয়টি অদূরদর্শিতারই পরিচয় বহন করে। আগের প্রতিষ্ঠানগুলো আগে এমপিও দিয়ে দিলেই কি ভালো হতো না। সব মিলিয়ে বর্তমানে সাত হাজারের বেশি নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই সব প্রতিষ্ঠানে প্রায় পৌনে দুই লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত আছেন।

শিক্ষক তো শিক্ষকই। শিক্ষার মান বাড়িয়ে তোলার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই। ধর্ম চর্চা ধর্মালয়ে চললেও ধর্মকে জাগিয়ে তোলার জন্য কিন্তু কিছু সংখ্যক ধর্মানুরাগী ও ধর্ম শিক্ষায় পারদর্শী লোকের প্রয়োজন হয়। ঠিক তেমনি শিক্ষার চাকাকে সচল ও বেগবান রাখতে শিক্ষিত ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তির আবশ্যকতা পড়ে। শিক্ষার কাজ যেমন ধর্মানুরাগীকে দিয়ে হবে না। আবার ধর্মানুরাগীকে দিয়ে শিক্ষার হালচাল ঠিক রাখা যাবে না। শিক্ষার সঙ্গে ধর্মের একটা নিবিড় সম্পর্ক থাকলেও কিন্তু দুটি ধারা একই সূত্রে গ্রথিত হয় না। যাকে দিয়ে যেই কাজটি সুন্দর হবে তাকে দিয়ে সেই কাজটিই করানো উচিত।

একজন শিক্ষক সে তো জাতির নির্দেশিকা। একজন বিদ্যার্থীর গুরু তথা শিক্ষাগুরু। সেই শিক্ষাগুরুরা আজ এদেশে অবহেলিত! অবশ্য ঢালাওভাবে সব শিক্ষকের ক্ষেত্রে এমনটি বলা ঠিক নয়। শুধু স্কুল কলেজের নন-এমপিও শিক্ষকরা আজ বড়ই বিগলিত। তারপরও আবার মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এল বৈশ্বিক মহামারী। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। শিক্ষার্থীরা পেল অ্যাসাইনমেন্ট। করোনার উপদ্রব বাড়তেই আছে। এক ঢেউ যাচ্ছে তো আরেক ঢেউ এসে হাজির হচ্ছে। লণ্ডভণ্ড জীবন, ভালো থাকার পথটা গেল বেঁকে। মানুষের জীবনযাপনে এলো বিধিনিষেধের বেড়া। গরিবের ভিতরে আরও গরিব বের হলো। সরকারপ্রধান অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টায় আছেন। আজও সে প্রচেষ্টা অব্যাহত। করোনার টিকা আবিষ্কার হলো। বাংলাদেশে পিছিয়ে গেল না। ভ্যাকসিন কিনে বিনা পয়সায় সাধারণ জনগণকে দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আমাদের সৌভাগ্য বিশ্বে করোনায় মৃত্যুহার দেখে আমরা আতঙ্কিত, ভয়ার্ত হলেও আল্লাহর রহমতে ও আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানের সময়োচিত কিছু সিদ্ধান্তের জন্য বিশ্বের তুলনায় আমাদের মৃত্যুহার অনেকাংশে কম। এটা আমাদের দেশের ও সর্বোপরি দেশপ্রধানের প্রতি শ্রদ্ধাই বাড়ায়।
করোনায় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ হয়নি। অর্থনীতির ভাব মন্দা গেলেও দেশপ্রধান সবই সামলে নিয়েছেন। নন-এমপিওদের প্রণোদনা দিয়েছেন। এটা করোনাকালে এক মহাকাব্যিক বিষয়। শিক্ষকরা যখন কপদর্কশূন্য তখন প্রধানমন্ত্রীর এই প্রণোদনা সবার মাঝে আলো হয়ে ধরা দিয়েছে। নন-এমপিও সকল শিক্ষক-কর্মচারীর মাঝে কী প্রণোদনার টাকাটা পৌঁছাল? না, পৌঁছেনি, যথাযথভাবে কাজটি করা গেল না কেন? কোন দুষ্টচক্র এই কাজের সঙ্গে জড়িত। তাদের কি প্রচলিত আইনের আওতায় আনা যেত না। জনগণের সামনে ওদের মুখোশ উন্মোচন করা যেত না। দ্বিতীয় প্রণোদনায় আবার নতুন কিচ্ছা হলো। একই প্রতিষ্ঠানে কজনা পেল, আবার কজনা পেল না। এই অব্যবস্থাপনার জন্য কাকে দায়ী করা যায়! তথ্য বা উপাত্তের সমস্যা হতে পারে কী? না, তা কী করে! দেশ তো ডিজিটালাইজেশনের মহাসড়কে কুচকাওয়াজ করছে। তাই আক্ষেপই আসে কেন এমন হলো? কেন এমন হয়?

যে সমস্ত শিক্ষক প্রণোদনা পেয়েছেন এবং যারা পাননি প্রত্যেকেরই একই কথা, আমরা প্রণোদনা চাই না। চাই এমপিও। এভাবে আর বেঁচে থাকা যাচ্ছে না। আসলেই তাই নন-এমপিওরা আর কত অপেক্ষা করবে? নীতিমালার বাইরে কোনো কাজ করা যাবে না। হ্যাঁ কথা সত্য। নীতিমালা পরিবর্তন করা যায়। সহজ শর্তে এমপিও দেওয়া এখন সকল নন-এমপিও ব্যথিত প্রাণের জোর আকুলতা।

এই তো কদিন আগে আমি রাত নটা নাগাদ ওষুধ আনতে বাইরে বের হলাম। যেখানে থাকি সেখান থেকে আমার ওষুধ পাওয়ার দোকানটি একটু দূরে। অটোরিকশা খোঁজ করতে থাকলাম। রাস্তায় তেমন যানবাহন নেই। মাঝে মধ্যে দু’একটা রিকশা চলছে। হঠাৎ একজন এলো। আমার যাওয়ার স্থানের কথা বলে উঠে বসলাম। লোকটির মুখ ঢাকা। মাথায় পাগড়ির মতো করে গামছা প্যাঁচানো। এখন তো ঠান্ডা না তবে লোকটি কেন এভাবে আছে, মনের মধ্যে প্রশ্নের সূর্য এসে উঁকি ঝুঁকি মারল। প্রশ্নের উত্তর চাই। আগ্রহ বাড়ছে। একপর্যায়ে এমন হলো আমাকে জানতেই হবে। জিজ্ঞেস করলাম, ভাই তুমি এমনভাবে মুখ মাথা জড়িয়ে কেন? তোমার বাসা কোথায়? আমার প্রশ্নের তীব্রতায় রিকশাচালক কোনো উত্তর দিল না। আমার একটু রাগই হলো। আবার ধমকের সুরে একই প্রশ্ন করলাম। লোকটি শীতল করুণ স্বরে পরিচয় দিল। লোকটি একজন নন-এমপিও শিক্ষক। দিনের বেলায় এমন কাজ করতে পারে না তাই রাতের বেলাতে অটো চালানো। ‘ও’ না, এখানে আর ‘ও’ বলে সম্বোধন করা ঠিক হবে না। বরং শিক্ষক বলেই সম্বোধন করি। শিক্ষকটি কথা বলতে বলতে চোখের পানি ফেলছিল আর বলছিলেন, ‘আমি এমএ পাস করে, শিক্ষক নিবন্ধন পাস করি, মনে-প্রাণে একজন আদর্শ শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। বাবা কিছু জমি বিক্রি করে কয়েক লাখ দিয়ে একটি নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানে ঢুকিয়ে দিলেন। আজ আট বছর। সে প্রতিষ্ঠান আজও এমপিও হয়নি।

সংসারে খরচ তো বসে নেই। বাবা আর পারেন না। করোনা এলো। টিউশনি করে যা আয় হয় তাও বন্ধ। আর কীইবা করব। দিনের বেলায় রাস্তার বের হওয়া যায় না। অনেকেই শিক্ষক হিসেবে চেনে। তাই রাতে বের হয়েছি। ভাড়া অটো নিয়ে চালাচ্ছি।’ আমি বিচলিত হয়ে গেলাম। বিচলিত ভালোবাসায় বললাম, ভেঙে পড়বেন না। গণতান্ত্রিক সরকার কিছু একটা করবেই। ভরসা রাখুন। ইনশাআল্লাহ সব একদিন ঠিক হয়ে যাবে। আমার কথায় শিক্ষক বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। কিন্তু হয়তো সেদিন আমি আর থাকব না।’ উনার কথার কোনো জবাব দিতে পারলাম না। শুধু অদৃষ্ট বিড়ম্বনার কাছে হার না মানা শিক্ষককে আবার দেখে নিলাম। আমি ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

শিক্ষকটির কথা হজম করতে পারছি না। কী করব? আমার কিছু করার নেই। এরকম বহু ঘটনার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি বহুবার। কবে এ জাতি নন-এমপিও শিক্ষকের অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে। নন-এমপিওরা এমপিও থেকে বঞ্চিত হলেও প্রতিষ্ঠানে পাঠদান থেকে সরে দাঁড়ায়নি। শিক্ষকতা যাদের ধ্যানে-জ্ঞানে লেপটে আছে তারা শিক্ষার্থীদের নিয়ে মেতে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। তারা তো নিজের কাজ সুষ্ঠুভাবে করছেন। শিক্ষার মান উন্নয়ন ও আদর্শ নাগরিক গড়তে কাজ করছেন। শিক্ষার বিকাশ ও প্রকাশে যারা বিনা বেতনে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের শুধু শুধু নীতিমালার ফাঁদে না ফেলে মানবিক হয়ে এমপিও দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শিক্ষার আবহ চমৎকার আর বাস্তবসম্মত করতে হলে শিক্ষালয়ে পাঠদানকারী শিক্ষকদের পাশে সহানুভূতি ও সহযোগিতার দয়ার্দ্র মন নিয়ে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। সকল নন-এমপিওদের একসঙ্গে এমপিও করা চ্যালেঞ্জিং হবে সত্য, কিন্তু নন-এমপিওরা এতদিন রাষ্ট্রের জন্য নিজেদের দায় ও দায়িত্ব থেকে দূরে যায়নি। তো রাষ্ট্রপ্রধান কেন চ্যালেঞ্জটাকে গ্রহণ করবেন না। আমার বিশ্বাস, সরকারপ্রধান শুধু একটু দৃষ্টিপাত করলে আর ইচ্ছে পোষণ করলেই অসম্ভব বলে কিছু থাকবে না। যে দেশে নিজেদের খরচে পদ্মা সেতু হয়, রোহিঙ্গাদের থাকার ঘর হয়, কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিনামূল্যে দেশবাসীকে করোনার টিকা প্রদান করা হয়- সেখানে নন-এমপিওদের এমপিও করা কোনো ব্যাপারই হবে না।

জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এমপিও না পাওয়া শিক্ষকরা পেয়ে যাক এমপিও। জাতির মেরুদণ্ড সোজা হোক এই প্রত্যাশা আমাদের।

গোলাম মোর্তুজা : প্রভাষক (বাংলা) মাসকাটাদীঘি স্কুল অ্যান্ড কলেজ
শ্যামপুর, কাটাখালী, রাজশাহী

কবি অলোক আচার্য

সকল পোস্ট : অলোক আচার্য