নজরুল: চেতনায় ছিলেন সমকালীন, স্বাধীনচেতা।। নীলকণ্ঠ জয়

আজ ২৯ আগস্ট, ২০২২। আজ থেকে ঠিক ৪৬ বছর আগে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের এই দিনটিতেই প্রয়াত হয়েছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৭৬ সালের এই দিনে বাঙালি জাতিকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে বিদায় নেন সকলের প্রাণের কবি। দীর্ঘ ৩৪ বছরের কবির নীরবতা ছাপিয়ে শোকের মাতম ওঠে জাতীয় জীবনে।

পুঁথিগত শিক্ষা ছিলো না কবির। কিন্তু তিনি ছিলেন সকলের শিক্ষক। আদর্শ আর চেতনায় ছিলেন সমকালীন। ডিগ্রিধারী ছিলেন না তিনি, ছিলেন সবার মাথার মুকুট। তথাকথিত শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই মানুষ প্রকৃত মানুষ হয় না। আদর্শগত শিক্ষার দাম অনেক বেশি, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন তিনি। তাঁর লেখনী, তাঁর আদর্শ এবং চেতনার মূল্য অমূল্য।

ব্রিটিশ আমলের কথা। ব্রিটিশদের আগ্রাসন চলছে তখন ভয়াবহরূপে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এক অধরা বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সম্রাট শাহ্ আলমের সময় কাজী বংশের পূর্বসুরী পাটনার হাজীপুর থেকে বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামে এসে বসবাস করা শুরু করেন। পাঠান মোঘল শাসন আমলে কাজী বংশের লোকেরা বিচারকের দ্বায়িত্ব পালন করতেন। আর সেই সুবাদে সম্রাটের কাছ থেকে পেয়েছিলেন আয়মা সম্পত্তি। অর্থাৎ যে সম্পত্তি সম্রাটের অধিনস্তরা ভোগ করতে পারতেন বিনা খাজনায়।

সেই কাজী বংশের কাজী ফকির আহম্মেদের ঔরসে,মাতা জাহেদা খাতুনের কোলে ১১ জৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ; ২৪ মে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার জন্মগ্রহন করেন আমাদের অহংকারের প্রতীক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম । তার মাতা পরপর চারটি মৃত সন্তান প্রসব করেন। পঞ্চমবারও আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন জীবিত সন্তানের কিন্তু তিনি এলেন সকল দুঃখকে জয় করে, তাই তাঁর ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিঞা’।

চাচা কাজী বজলে করিমের নিকট ফার্সি ও উর্দু ভাষা শিখতে থাকেন। কাজী নজরুল বাল্যকালেই পরিস্থিতির প্রভাবে অনেকটা বাউণ্ডুলে স্বভাবের হয়ে ওঠেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে পীর ফকির, সন্ন্যাসী, বৈষ্ণব বাউল, সুফী দরবেশের আস্তানায় যেমন যেতেন ,তেমনী আশপাশের হিন্দু পরিবারে ভাগবাত, রামায়ন, মহাভারত পাঠের আসারেও যোগ দিতেন। আবার কখনও সাধু সন্তু, পীর ফকিরের সাথে উধাও হয়ে যেতেন, আবার ফিরে আসতেন। তাঁর এরূপ খাম-খেয়ালী এবং উদাসীনতায় কেউ কেউ তাঁকে কখনও “নজর আলী” কখনওবা “তারা ক্ষ্যাপা” বলে ডাকতেন । উনবিংশ (বিংশ) শতাব্দীতে বাংলার গ্রামগঞ্জে কবি-কীর্ত্তন, বাউল, সারি গানের হাওয়ায় পল্লীতে প্রকৃতি মুখরিত হয়ে উঠত।

নজরুলের গ্রামেই ছিল শেখ বাক্র আলী গোদার কবি গানের দল, তিনি সে দল ভিড়ে গেলেন। অল্পদিনেই কবি দলের গোদা শেখ বক্র ক্ষুদে কবির কবিত্বে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, “এই ব্যাঁঙাচি বড় হয়ে সাপ হবে”, হয়েছিলেনও তাই। অল্পদিনের মধ্যেই নজরুল সে দলের সেরা কবিয়াল হিসেবে সকলকে মুগ্ধ করেছিলেন।

অল্পদিনের মধ্যেই নজরুল সে দলের সেরা কবিয়াল হিসেবে সকলকে মুগ্ধ করেছিলেন। এই লেটো কবির দলে থেকে সেই বাল্যকালে তিনি “রাজপুত্র” ‘চাষার সং,কবি কালিদাস, শকুনি বধ’ প্রভৃতি পালা রচনা করেন। যেমনঃ ‘অসংখ্য গ্রাম নগরাদি/দূর্গ গুহা পর্বত আদি কত নদনদী/ দেখিলাম কিন্তু নিরবধি/ স্বদেশ জাগিছে অন্তরে” (রাজপুত্র)।

নজরুল ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী বাঙালি কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সংগীতজ্ঞ, দার্শনিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ – দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত।

১৯২২ সালে নজরুল ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ব্রিটিশরা ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা অফিসে তল্লাশি চালায়, কবিকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এর পর তাঁকে হুগলি জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। তিনি এখানে অনশন শুরু করেন। এক মাসের বেশি তিনি অনশন করেন। ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে নজরুলকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯২৫ সালে তিনি সাপ্তাহিক ‘লাঙ্গল’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর এত কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ আর গান কেউ লেখেননি। ছোটোগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। নজরুলের গানের সংখ্যা চার হাজারের বেশি। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গানগুলিকে নজরুলগীতি বলা হয়। তাঁর রচিত বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, সাম্যবাদী, সর্বহারা, ফণীমনসা, প্রলয় শিখা ইত্যাদি। নাটক – দাতা কর্ণ, কবি কালিদাস, রক্তকমল, মহুয়া, জাহাঙ্গীর, কারাগার, সাবিত্রী, আলেয়া, সর্বহারা, সতী। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বাংলা সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার জগত্তারিণী স্বর্ণপদক নজরুলকে প্রদান করা হয়। ১৯৬০ সালে ভারতীয় তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মভূষণে ভূষিত করা হয় তাঁকে।

১৯৪০ সালে কবির স্ত্রী প্রমীলার কঠিন পক্ষাঘাত হয়। কবি মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েন, তাঁর মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে। ১৯৪২ সালে তিনি একেবারে মূক হয়ে যান। দেশে বিভিন্ন ভাবে তাঁদের চিকিৎসা করা হয়। এখানে চিকিৎসায় সফল না হওয়ার জন্য বিদেশে লন্ডনে, ভিয়েনায় পাঠানো হয়। কবির স্ত্রীর মৃত্যু হয় ১৯৬২ সালে। ১৯৭১ সালে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ তৈরি হয়। ১৯৭২ সালে নজরুলকে বাংলাদেশের ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদানের সরকারি আদেশ জারি করা হয়। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। বাংলাদেশে তাঁর মৃত্যু উপলক্ষ্যে দু’ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয় এবং ভারতের আইনসভায় কবির সম্মানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

কবি নীলকন্ঠ জয়

সকল পোস্ট : নীলকন্ঠ জয়