কপোতাক্ষের ঢেউয়ের দোলায়

মীম মিজান
আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। বহুবর্ণিল। দেশের অনেক জায়গায় নাকি বৃষ্টি হচ্ছে। ট্রেন চলার শব্দের এক দারুণ রিদম। আমার গ-বগির আসনগুলোর কয়েকটি তাদের যাত্রী পায়নি। শুধু সেই আসনগুলোর ছিটেফোঁটা সৌন্দর্য উঁকি মারছে। তেল চিটচিটে, খাবলা খাবলা জমিনের মতোই আসনগুলোর বহিরাবরণ। অনুজ্জ্বল। মিইয়ে পড়া যাত্রীদের মধ্যে একটি বালকই অত্যুজ্জ্বল। বাবার হাত থেকে মোবাইল ফোনটি নিয়ে মট-পাটলু দেখছে আর চোখমুখে খুশির ফোয়ারা ঝরছে।
নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে আসলো রাজশাহী রেলস্টেশন। সকালবেলা সাগরদাঁড়ি নামক রেলগাড়িতে ভর করে মাইকেলকে অনুভব করে মীর মশাররফ হোসেন, লালন সাঁই আর রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির লীলাভূমি জেলা কুষ্টিয়ায় যাবো। কিন্তু অনলাইনে খোঁজ নিয়ে আসন না পাওয়ায় কপোতাক্ষের ঢেউয়ে ভর করেছি। এই কপোতাক্ষ নামক ট্রেনটি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, ‘‘সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে/ সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।’ তাই মাইকেলকে ভাবছি। ভাবছি পদ্মার কথা। কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই ‘পদ্মানদীর মাঝি’ পড়লে তার কোনও ছিটেফোঁটা প্রবহমানতা দেখি না পদ্মায়। আবার প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আব্দুল আলীমের গাওয়া সেই ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী, তোর কাছে সুধাই’ শুনে দেখি এই পদ্মার কে সর্বনাশ করলো! আমাদের আর কতভাবে বঞ্চিত করবে বন্ধু নামক দুর্মর রাক্ষুসে ভারত। এলাকার লোকজনের নাকি সতত মনে পড়ে কপোতাক্ষকে। কেননা সেটি আজ মৃতপ্রায়৷ মাইকেলের সেই শানবাঁধানো ঘাটে কোনও জল নেই। এসব নদী ও প্রকৃতির মরে যাওয়ার কথা মনে হতেই বিষাদ ভর করলো মনে। সেই বিষাদগ্রস্থ মনটি কিঞ্চিৎ দোল খাচ্ছিলো সুখের সমীরণে। কেননা ট্রেনে ওঠার আগে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক স্যারের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করতে পেরেছি এই ভেবে।
গাঢ় সবুজ আমের বাগান। দূর থেকে পাহাড়ের মতো মনে হয়। বহুবর্ণিল মেঘের পেটে মিশে গেছে। চারদিকে সবুজ ধানখেত। তারই মাঝখানে সোনালি ধান ও আঁটি কৃষকের কাস্তে হাতে মাথায় গামছা বেঁধে গুনগুনিয়ে গান গেয়ে পোচের পর পোচ খাওয়ার অপেক্ষায়। পাশের ডোবার আলে ম্রিয়মাণ কয়েকগোছা কাশফুল জানান দিচ্ছে মাত্রই শরৎ বিদায় নিয়েছে।
আব্দুলপুর থেকে দূর পশ্চিমের আকাশে দেখা যাচ্ছে ঝর্ণার পানির তোড়ে কেটে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া পাথরের ধারালো রূপের উজ্জ্বল সফেদ অম্বর। অম্বরের ঢেউয়ে চলে গেছিলাম মুখপুস্তিকার জগাখিচুড়ি ওয়ালে। ওয়াল থেকে নজর ফিরতেই কালো মতো গোবর কোয়ালিটির স্তুপাকার পদার্থ দেখতে পেলাম। এক দুষ্ট-মিষ্টি গন্ধ মাস্ক ছেদ করে নাকে ঢুকে জানান দিচ্ছে এগুলো চিনিকলের উচ্ছিষ্ট। ও তার মানে পৌঁছে গ্যাছি উত্তরবঙ্গ চিনিকলে। কয়েকটি জরাজীর্ণ বিল্ডিং না পেরুতেই ও আল্লাহ ভয়ানক এক শব্দ অপরপক্ষ থেকে। ভয়ে কেঁপে ওঠে বুক। থুতু ছিটালাম বুকে। আচমকা এমন শব্দ করে সবুজের বুকে শাদা ডোরার এক ফিরতি ট্রেন। ভ্যাবাচ্যাকা কেটে ওঠার আগেই আজিমপুর রেলস্টেশনে দাঁড়ালো ট্রেন। 
বুকে ছেটানো থুতুতে যেমন যত্রতত্র ভিজে গেছে গোছা লোমশ বুক। তেমনই মেঘের ছিটানো প্রেমের ফোঁটায় লোহার পাত ও স্টেশনের মুঠো কয়েক যাত্রী নিয়ে ভেজা রূপ। চারপাশে চোখের সীমানা প্রাচীর পর্যন্ত আঁখখেত।
ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন। যত্রতত্র দাঁড়িয়ে লাল, সবুজ, নীল বর্ণের ট্রেন, ট্রেনের বগি। মালগাড়ি দাঁড়িয়ে উদরপূর্তি মাল নিয়ে। সিলগালা মুখে। সবগুলোই ভারত থেকে আসা। হিন্দি অক্ষরের চিহ্ন স্পষ্ট। কয়েকটি বগির ছাদও সিলগালা করা। না মানে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল সেগুলোর উপর প্রলেপ। টনকে টন পাথরের টুকরোর স্তুপ। পাঁচটি প্লাটফর্ম নিয়ে, টিন ও লোহার সারি সারি স্থাপনা। এটাকে যদিও বাংলাদেশের বৃহত্তম রেল জংশন বলা হয়, প্রকৃত পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশন বাংলাদেশের বৃহত্তম জংশন। 
উত্তরদিকে সারি সারি করে অনেকগুলো মালবাহী ট্রেনের শৃঙ্খলিত বগি। ভাবছিলাম একখানা ঝাক্কাস ফটো তুলে বেহতার আক্কাস হবো। ওমা গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। সবেধন নীলমনি মোবাইল নষ্ট করে ছবি খিচা থেকে বিরত থাকলাম। মশারা যেমন একনাগাড়ে বেসুরো গান গায়। আর আমরা তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে ঠাস করে থাপ্পড় লাগাই। অনুরূপ থাপ্পড় দিতে ইচ্ছে হলো ‘এ্যাই, শান পাঁপড়ি…’, ‘এই রুটি, রুটি…’, ‘কলা, কলা…’, ‘আমড়া, পিয়ারা, আমড়া…’, ‘ এ্যাই, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, কাঁচাগোল্লা…’ একনাগাড়ে বগিভর্তি ডাকগুলোর প্যান প্যান, ঘ্যানঘ্যান করাদের। না, তা করা যায় না। এই করে তো জীবিকা নির্বাহ করে। কারো তো পকেট মারছে না। রাজনীতি করেও চুষে খাচ্ছে না। 
‘লঙ্গি নেবেন, লঙ্গি…’।  আরে বাবা লুঙ্গি তো সবাই কয়, হ্যায় আবার লঙ্গি কয় ক্যালা? দেহি মুহের দু’সারির মাঝখানে ফাঁকা। মাড়িতে কয়েকটি দাঁত তরমুজের বিচির লাহান কাইল্যা। দাঁতের গোড়ায় জিহবার আগা লাগাইয়া মাখরাজ খাটাইয়া তাই লুঙ্গি বলতে পারেন না সত্তুরের কোটার লুঙ্গি হকার। 
প্রথমে মৃদু। তারপর কড়াভাবে ভেঁপু বাজিয়ে জানান দিলো এখন পদ্মার দিকে ছুটে যাবে। পদ্মার বুকে বৃহৎ রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। সেটিতে ঝকাঝক শব্দ করে পার হবে। আর আমরা পাবনা ছেড়ে ঢুকে যাবো কুষ্টিয়ায়। ঝুপ করে বৃষ্টি নামা শুরু হলো। যারা কুলি মজুর ওরা ঐ ট্রেনের বুক থেকে বৃষ্টির মধ্যেই মাল খালাস করছিলো। আমার চোখ থেকে নজরুলের ‘কুলি মজুর’ কবিতার মতো জল না গড়ালেও ওদের পেটানো শরীর থেকে ঘর্মাক্ত পানি চুয়ে চুয়ে পড়ছিলো। খানিক পরেই ট্রেন দাঁড়ালো। দেখলাম পাকশি। 
পরিপাটি দেখাচ্ছে বৃষ্টিতে ভেজা স্টেশনটিকে। প্লাটফর্ম থেকে ট্রেনে ওঠার জন্য করোনার সামাজিক দূরত্বের চিহ্ন গোল গোল শাদা দাগ। কিন্তু কই লোকজন সেখানে দাঁড়িয়ে। সবাই ছাউনিটার নিচে একত্রিত ভয়ভীতি মাড়িয়ে। এ ভয় কি বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার ভয়? নাকি রোগকে থোড়াই কেয়ার না করার অবক্ষয়? 
লাল জামা পরিহিতা ছোট্ট বালিকা জবুথবু ভিজে। দৌড়ে এসে ছাউনিতে দাঁড়ালো। খেয়াল করে দেখলাম মাথায় লাল পশমওয়ালা চুলের ব্যান্ড, পায়ে লাল হিল, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। কী ম্যাচিং! রুচির পরিচয় তার সাজ পোশাকে। বাবা চিকনচাকন। কিন্তু লাগেজের বোঝায় দৌড়াতে পারছেন না। এ এক প্রতীক। কোনও বিপদে পড়লে ছেলে-সন্তানদের নিরাপদে পৌঁছায়ে দিয়ে নিজেকে আস্তে-ধীরে নিরাপদ স্থানে পৌঁছায়। কিন্তু বাবা-মা’দের কী অবস্থা আজ! বৃদ্ধাশ্রমে তারা নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করছেন। আর আমরা পার্টি, হৈ-হুল্লোড় আর বন্ধুবান্ধব নিয়েই ব্যস্ত।
লাইন থেকে নিচে লাল রঙের উপর শাদার ডোরা দিয়ে সৌন্দর্যময় দু’টো ভবন। এগুলো রেলওয়ে কতৃপক্ষের। চোখ ফেরানো দায়। আর বৃষ্টির ধারা ডাকে, আয়।
বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রেলসেতুর উপর আমরা। পদ্মার বুকে ঘোলাটে পানির দুর্মর ঢেউ। দূরে দেখি নদী বক্ষে কয়েকটি ইলেকট্রিক হাত ছড়ানো স্টিলের পিলার। বৃষ্টির আবছায়া আবহে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার দিকের গাছগাছালি নজরে পড়ছে। পাকশি বা পদ্মার পূবপাড় ঘেঁষে বোট, নৌকো, বালুর ড্রেজারের জটলা। পাড়ের উপরেই বালুর শোপ্লেস। নীল নেট দিয়ে খেতের মতো ঘেরা। ছাতা, ছাতাহীন কয়েকজন বালুর তদারকিতে মশগুল। কয়েকটি তোষা নৌকো উল্টানো।
আবার হুড়মুড়িয়ে ভেড়ামারার দিক থেকে তুমুল বেগে একটি ট্রেন আসছে। দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম সেটির নাম পরিচয় উদ্ধারে কিন্তু তা বেগের জোড়ে ব্যর্থ হয়েছি। ওপারে মাত্র তিনটে বোট দাঁড়ানো। এই ব্রিজের পাশেই লালনশাহ সেতু। পাশাপাশি দু’টো ব্রিজের বুকে বয়ে চলা ট্রেন আর বাস-ট্রাক-মোটর সাইকেল বৃষ্টির জলের মধ্যে এক দারুণ দৃশ্যের অবতারণা করেছে। দৃশ্যের মাঝেই চোখ খুঁজে ফিরলো স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর বোমের আঘাতে ভেঙেপড়া ১২ নম্বর স্প্যানটির কোথাও কোনও দাগ-চিহ্ন আছে নাকি?
ভেড়ামারা স্টেশনে দাঁড়ালো ট্রেন। পেছনে একজন গোঁফওয়ালা ব্যক্তি বলে ওঠেন, ‘আচ্ছা স্যার, এই জাগার নাম ভেড়ামারা হইলো ক্যান?’ পাশের জন হাসতে হাসতে জবাব দিলেন যে, হয়তো কোনও পালোয়ান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি এমনটাই পালোয়ান যে, বাহাদুরি দ্যাখাইতে বাঘ না মাইরা ভেড়া মাইরা ফালাইছে। হ্যার লাইগা হয়তো বীরত্ব সূচক ভেড়ামারা নামকরণ করছে।’
আমার লেখার মোবাইলের নোটপ্যাড থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বললাম, নারে ভাই তা না। বলা হয়ে থাকে যে,  ব্রিটিশ পিরিয়ডে এ এলাকায় প্রচুর ভেড়া পালন করা হতো। আর এ এলাকা দিয়ে সেসময় থেকেই রেলগাড়ি চলে। এই জায়গায় ট্রেন যাওয়ার সময় কোনও কারণে শত শত ভেড়া লাইনে চলে এসেছিল। ট্রেন তার সবেগে চলে যাওয়ায় অধিকাংশ ভেড়াই কাটা পড়ে। তখন থেকে নামকরণ হয় ভেড়ামারা। ওনারা পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।
ধানখেতের মাঝে মাঝে ছাউনিগুলো দিয়ে কী যেন ঢাকা। বুঝে ওঠার মতো ফুরসত দেয়নি কপোতাক্ষ নামক ট্রেনের ঢেউ। বেশ কয়েকটি ট্রেন আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গ্যালো। মিরপুর নামক স্টেশনে দাঁড়ালো ট্রেন বেশ সময়। সম্ভবত ক্রোসিং পড়েছিলো। অপরিচ্ছন্ন একটি স্টেশন। পশ্চিমে একটি যাত্রী ছাউনি। তারই নিচে সফেদ টায়েলস করা লম্বা চেয়াররূপী বেঞ্চ। আর সেখানেই সার ধরে বসেছে দু’জন মহিলা, চারজন পুরুষ। তাদেরই একজন মহিলা ঝালমুড়ির ট্রেদানীর অদূরে দাঁড়ানো শার্টের স্লিভের বোতাম খোলা পকেটে পুরানো হাত, প্যান্টে কত্ত কত্ত পকেট, মাথার চুল খোপা করা, ভাবুক ছেলের দিকে অষ্টমাশ্চর্যের ন্যায় তাকিয়ে আছেন। সরকারি কম্বলের বিছানায় শায়িত মায়ের পাশে দু’ভাইবোনের খুনসুটি। মা গভীর ঘুমে মগ্ন। অদূরেই বসে বাবা গামছা গায়ে বিড়ি ফুঁকছে। এদের দিকে একটি শালিক ধ্যানে তাকিয়ে। ছাউনির উত্তরে দু’জন ছেলে দাঁড়িয়ে। একজন মোবাইল গুঁতানোতে নিরোর বাশি বাজানোর প্রতীক। অন্যজন ধ্যানমগ্ন শালিককে পরখ করছেন।
মিরপুর যে বাজার বা থানা শহর সেটির পাশেই একটি নদী বয়ে গেছে। দোকানপাট আর বাড়িঘরের চালের টিন মরিচা পড়ে ক্যামন জীর্ণ ভাব। 
পৌঁছে গ্যাছি পোড়াদহে। এটিই আমার শেষ স্টেশন। ব্যাকপ্যাক পিঠে নিয়েই এগুচ্ছি গেটের দিকে, ‘ওই মিয়া হটেন! সামনে ক্যামনে খাম্বার মতোন খাড়ায় থাকে!’ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পেছন ফিরে তাকালাম। দেখি মেটে রঙের পাঞ্জাবি পরিহিত এক বৃদ্ধ লোক রাগে ক্ষোভে ফুঁসছেন। তার দু’হাত ধরে পেছন বরাবর দাঁড়িয়ে আছেন এক যুবক।
আমাকে আই কন্টাক্ট করে তার মাথায় কানের উপর শাহাদাত আঙুল দিয়ে একটি ভঙ্গি করলেন। যার অর্থ দাঁড়ায় বৃদ্ধ লোকটা ভারসাম্যহীন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।